চাঁদ রাতে অমৃত ভোগ

প্রথম অমৃতভোগের স্বাদটা পাই সন্তোষের বাড়িতে। সন্তোষ  ওরফে আজম, সম্পর্কে আমার নন্দাই। সদানন্দ মানুষ বলে আজম আমাদের কাছে "সন্তোষ"। 

ম্লেচ্ছ বাড়ি নিয়ে ছুৎ-মার্গ আলাদা করে আমার বাপের বাড়িতে কখনো দেখিনি।  হতে পারে দেশ ভাগের আগে পূববাংলাতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির যে ধারা রক্তে বহমান ছিল, সেই সুখ স্পর্শের কারনেই এ দেশে চলে আসার পরে আমার ঠাকুর্দা আলাদা করে ওই বিভাজনটা করার কথা ভাবেননি। তবে এটাও সত্যি যে আমার বাপের বাড়িতে কেউ ভালবেসে কোনো মুসলমান বা মুসলমানির সাথে আত্মীয়তা করতেও চায়নি। চাইলে তখন পরিবারে লঙ্কাকান্ডের ঝাঁঝ কতটা হতো এখন ভেবে বার করা কঠিন ।

আমার বিয়ের সময়  শ্বশুরবাড়ির লোকজন সামান্য সিঁদুরে মেঘ দেখতে পেয়েছিল বিয়ে তাদের বাড়ির  ছেলের সাথে হতে বাঁধা প্রাপ্ত হবে কিনা এই ভাবনায়...আমার ঠাকুর্দা মেনে নেবেন কিনা এই সত্য যে, আমার ননদিনী, কমলকলি  ওরফে আমাদের কমল  ততদিনে নিষ্ঠাবতী  মুসলমানি বহু ফাহিম ফাতিমা।

ঠাকুর্দা আমার শ্বাশুড়ি মা'কে আলাদা সম্মানের চোখে দেখেছিলেন যখন জানতে পারেন, মেজাজী কর্তার মেজাজ উপেক্ষা করে এবং  বাড়ির অন্য সকলের  ওজর আপত্তিকে  "কোই পরোয়া নেহি" জানিয়ে...."সবাই সদা আনন্দে থাকুক" এই মতবাদে বিশ্বাস রেখে, আত্মজার পাশে থেকে শ্বাশুড়ি-মা নিজে দাঁড়িয়ে  মেয়ের হাত সঁপেছিলেন আজমের হাতে। সেটা ছিল ১৯৭৮ সাল। যাইহোক, সে ঘটনা বলতে আজ বসিনি...আজ আমার কথা "চাঁদ রাতে অমৃতভোগ" নিয়ে।


*******

বিয়ের পরে প্রথম ঈদের দাওয়াত। এর আগে কখনো ঈদের নিমন্ত্রণ ভাগ্যে জোটেনি। বছর চল্লিশ আগে বিরিয়ানি এখনকার মত নবাবি কৌলিণ্য হারিয়ে তখনও সহজলভ্য হয়ে পড়েনি। শুধুমাত্র কলকাতায় ক'টা বিশেষ মোঘলাই রেস্তোরাঁতেই মিলত সেই নবাব-ভোগ। পাড়াতে পাড়াতে রাস্তার পাশে লাল কাপড়ে ঢাকা বড় পেতলের বা এনামেলের হান্ডিতে  হাফ বা ফুল প্লেট পাওয়া যেত না। 

যাইহোক, বহু’র মাইকে থেকে মেহমান এসেছেন নিমন্ত্রণ রাখতে, আজমের খানদানি চেহারার আম্মি ফরাস পেতে দিলেন।

সেই ফরাসে মেহমানগন গোল হয়ে বসলেন। শুরু হলো অমৃতাকাঙ্খী মনের প্রতীক্ষা।  প্রতীক্ষারও তো রকমফের আছে...রাস্তার মোড়ে বাসের প্রতীক্ষা অথবা বিকেলে বাড়িতে পড়াতে আসা মাস্টারমশাইয়ের.. চেম্বারের বাইরে বসে ডাক্তারের.. মাস শেষে বেতনের..পরীক্ষার পরে রেজাল্টের আর লাবডুব মনে প্রেমের প্রতীক্ষার ধরন বা মনের আনচান আলাদা।  সেদিন ছিল প্রায় প্রেম-প্রতীক্ষা। 

ওস্তাগর লেনের সে বাড়িতে ঢুকতেই  নাকে এসে লাগল মন মাতান সুঘ্রাণ। ঘি-জাফরান-মিঠে আতর-মাংস-সুগন্ধী চালের সুবাস মিলে মিশে সে গন্ধ অবর্ণনীয়।  সে গন্ধ অনুভবের...স্বাদ গ্রন্থি খুলে যাওয়ার, মুখ গহ্বর নিঃসৃত লালায় ভরিয়ে দেওয়ার।

ফরাসে বসে আমি নতুন বউ, ঘোমটা মাথায় প্রায় নিমিলিত চোখে উপভোগ করতে করতে বুঝলাম গন্ধ আরো নিবিড় হয়েছে। চোখ খুলে সামনে দেখতে পেলাম মেহমানদের মাঝে দস্তরখানের ওপর রাখা জার্মান সিলভারের বারকোশ আকৃতির  বেশ কয়েকটি বড় বড় জয়পুরী থালা, তার ধার ঢেউ খেলানো... ভিতরে এনগ্রেভ করা ডিজাইন। সেই থালায় স্তূপাকার সাদা সাদা লম্বা দানার ভাত। সেই শ্বেতশুভ্র বর্ণের এ পাশ ওপাশ থেকে উঁকি ঝুঁকি মারছে কমলা রঙের ছিঁটে।  শিউলি ফুলের মতো  সেই পাকান্নের  বর্ণ শুভ্র এবং কমলার সংমিশ্রণ। ননদিনীর শ্বাশুড়ি আমনা বেগম, নিজে হাতে মেহমানদের প্লেটে সাজিয়ে পরিবেশন করছেন "অমৃতভোগ"!

সেই মুহূর্তে  অমৃতভোগের নবাবি পাকপ্রণালী জানার কোনো আগ্রহ মনে আসেনি,  লক্ষ্য ছিল কেবল স্বর্গীয় স্বাদ গ্রহণ।

এরকম পরিস্থিতিতে লজ্জা তুড়ি মেরে দুর না করলে নিজেরই লোকসান! অতএব,  নতুন-বউয়ের লজ্জাবনত ভাবটা কাটাতে প্রথমেই মনে এলো.. "ঘুঙ্ঘট-হাটাও"!  সরিয়ে দিলাম মাথায় টানা ঘোমটা।  অমৃতের আস্বাদন উপভোগে ঘোমটার বাঁধা অতিক্রম করলেও, মা'য়ের শেখানো কথা মনের আনাচকানাচে ...শ্বশুরবাড়িতে সকলের সামনে নতুন বউকে সলজ্জ ভাব বজায় রাখতে হয়, বড় হা করে বা মুখ খুলে খেতে নেই, খোক্কসীর মত খাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিকে মনে ভাসছে মা'য়ের সতর্কবানী... অন্যদিকে মুখে পুকুর! লাজের কি করি? ধুত্তোর!  অমৃতে লজ্জা নাস্তি।

আমার  মনন জুড়ে কেবল তখন সেই অমৃতভোগ।যার ওপরে ছড়ান বাদামি করে ভাজা পেয়াজের বেরেস্তা, যা মোঘলাই বিরিযানির অবিচ্ছেদ্য অংশ। লম্বা লম্বা সুগন্ধী ভাতের কোলে

সেই দেব-অন্নের মাঝে দৃশ্যমান মশলাদার মোলায়েম আলু এবং সুপক্ক মাংসখন্ড! নরম তুলতুলে সেই মাংস লেগে আছে হাড়ের সাথে। হাতের আলতো চাপে তা আলগা হয়ে গেল হাড়ের থেকে। গরাস মুখে তুলতেই, এক অনির্বচনীয় স্বাদে মন আচ্ছন্ন হলো...

"আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,

          চুনি উঠল রাঙা হয়ে"।

দাওয়াত শেষে...

আজমের আব্বাজান পুরুষ মেহমানদের মুআনাকা (কোলাকুলি) করে বললেন  তাকাবাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা (আল্লাহ তোমার ও আমার পক্ষ থেকে এই ঈদ কবুল করুন).. আম্মি সালাম করে বললেন ঈদ মোবারক...চাচা চাচি ফুপা ফুপু  মামা মামি আদাব জানিয়ে বললেন ঈদ মোবারক....বুজু সাজু রূপাই সোনাই  ঈদি (সালামি বা উপহার এটি  ঈদ উদযাপনের অংশ হিসাবে সাধারণত বড় রা ছোটদেরকে দিয়ে থাকেন)লাভে খুশি জানিয়ে বলল ঈদ মোবারক....

শ্বশুর খুড়োশ্বশুর মামাশ্বশুর ভাসুর দেবর উনি তিনি সে  সবাই বলছেন ঈদ মোবারক...ঈদ মোবারক...ঈদ মোবারক!  শুনতে শুনতে শুনতে ... সেদিনের সেই চাঁদ রাতে খুশি দেখতে দেখতে, আমার স্বর থেকে বেরিয়ে এলো... ঈদ মোবারক...সেই প্রথম বার!!

**************

এর কিছুদিন পরে সুযোগ হলো সেই অমৃতভোগ  রন্ধন প্রণালী সরাসরি চাক্ষুষ করার।

কমলকলি তার বাপের বাড়িতে নিজের হাতে রান্না করবে বাদশাহী খানা "বিরিয়ানি" সঙ্গে এসেছে ফেজটুপি মাথায় তাদের পারিবারিক ওস্তাদ খানসামা বৃদ্ধ আসগর আলি! তার কাছ থেকেই জানা, ফরাসীতে বিরিয়ান অর্থ "দমে রান্না" তাই বুঝি এই দেবভোগের নাম বিরিয়ানি। আসগর সাহাব জানালেন, যে বিরিয়ানি তিনি তাদের বহুকে সাথে নিয়ে বানাতে চলেছেন তা হলো অওয়াধি বিরিয়ানি বা দমপোখ্‌ত বিরিয়ানি।  দই শাহি মশলা এবং আরো নানা উপাদানে জারিত কষানো মাংস আর  সিকি শতাংশ রান্না করা ভাত পরতে পরতে সাজিয়ে বসানো হয় হালকা আঁচে। মাংসের সুরুয়া/ঝোল  সহযোগে রাঁধা হয় বলেই মতান্তরে একে ইয়াখানি বিরিয়ানিও বলা হয়।

এই অওয়াধি বিরিয়ানি নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের হাত ধরে কলকাতা মাতাতে আসে। ইতিহাস বলছে, ১৮৫৬ সালে কলকাতায় পৌঁছান নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ। এর পর কলকাতাতেই জীবনের শেষ ৩০ বছর কাটিয়ে দেন তিনি। লক্ষ্ণৌচ্যুত নির্বাসিত  নবাব  বাসা বেঁধেছিলেন মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে। সঙ্গে এনেছিলেন  সহস্র পাঁচক। নবাবের রসনা তৃপ্তির জন্যই  ‘দমপোখ্‌ত’ বা ঢিমে আঁচে ওই নবাব ভোগ রান্না করতেন তারা। পরে নবাবের পড়তি আর্থিক সঙ্গতির কারনেই হয়তো ভাতের মধ্যে মাংস খন্ডের সাথে মেলান হয় প্রমাণ সাইজের আলু। পড়তি আর্থিক অবস্থার কারনে, না  কি স্বাদ বর্ধন করতে সেটা তর্ক সাপেক্ষ। তর্ক বিতর্ক যাই থাক, তা ঐতিহাসিকরা বলবেন, বিরিয়ানির স্বাদ-গন্ধকে এ শহরের ভোজন রসিক মানুষ আপন করে নিয়েছেন তাই বিরিয়ানির ইতিহাস নিয়ে এখন আর তাঁদের মাথা ব্যাথা নেই ।

কলকাতা বিরিয়ানি’র সঙ্গে ভিন রাজ্যের বিরিয়ানির ফারাক বিস্তর। তবে  কলকাতার নিজস্ব আলু-মাংসের বিরিয়ানি কলকাতার বাইরেও এখন পছন্দের, হয়তো শুধুমাত্র আলু যুক্ত হওয়ার কারনেই।

বিরিয়ানির উৎপত্তি যে দেশেই হোক না কেন তাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন  নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের অওয়াধ  তাই এই লখনৌই বিরিয়ানিকে অওয়াধি বিরিয়ানিও বলা হয়। কথিত আছে লখনউতে বড়া ইমামবাড়া প্রস্তুতকালে মজদুরদের চটজলদি পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছিল এই পোলাউ পরবর্তিতে যা বিরিয়ানি নামে খ্যাত। বিরিয়ানির উৎস নিয়ে নানা রকম তথ্য পাওয়া যায়, আমি তাতে যাচ্ছি না। আমি লিখছি কাচ্চি গোস্ত  বিরিয়ানি (দম বিরিয়ানি)... ভাত- মাংস আর মশলার সমাহারে বানানো সেই নবাবি পলান্ন বানানোর প্রক্রিয়া বহুদিন আগে যা চাক্ষুষ করার  অভিজ্ঞতা আমার নিজের হয়েছিল।

আল্লাহ ’র নাম নিয়ে বৃদ্ধ খানসামা শুরু করলেন রান্না...

কেজি চারেক রেওয়াজি খাসির মাংসের (প্রতি কেজি আট কি দশ টুকরোয় কাটা) পেয়াজ, রসুন, আদা, ফেটান টক দই , স্বাদ মতো লবণ এবং বিভিন্ন শাহি মশলার উপাচার মিশিয়ে পাঁচ/ছয় ঘন্টা রেখে দেওয়া হলো, তারপর তাকে  অল্প কষান হলো, আধুলি শতাংশ সেদ্ধ মাংস তখন কাই মাখা ক্লাসিক।  বেছে নেওয়া পুরনো সেরা বাসমতী চাল দুই কেজি, সাবধানে জলের নীচে ধুয়ে নিয়ে ছড়িয়ে রেখে শুকনো করা হলো।  তারপরে ফুটন্ত জলে ফেলা হলো কাপড়ে বাঁধা হরেক রকম শাহি-গোটা মশলা, সেই মশলা-গন্ধী সুগন্ধী জলে সিকি সেদ্ধ হলো বাসমতী। এরপরে ধবধবে সাদা পাতলা কাপড়ে ফেলে মাড় ছেকে তুলে নেওয়া হলো জুঁই ফুলের মতো সাদা ঝরঝরে বাসমতী ভাত। এরপরে পুরু-তলার বিরাট এক হান্ডিতে পরতে পরতে সাজানো হলো কাই-মশলা মাখা মাংস তারপর ভাতের পরত তারপরে আলু, আলুবোখরা, কিসমিস, বাদাম, শুকনো ফল, ঘি... একপ্রস্থ হলে আর এক প্রস্থের পরত... এই ভাবে কয়েক পরত। ওপরে ছড়ান হলো আসলি জাফরান মিশ্রিত দুধ (কমলা রঙ হালকা ভাবে ছড়িয়ে  দিত), মিঠে আতর, কেওড়া জল। হান্ডির ঢাকনা ময়দার মোটা পরত দিয়ে আটকে দিয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করে সে হান্ডি দমে বসালেন আসগর সাহাব।

প্রায় অঙ্কের হিসেবে "দমদার দম"। ভাত গলবে না,  মশলাদার আলু হতে হবে  সুসিদ্ধ,  মাংস হবে তুলতুলে। প্রথমে রান্না হবে চড়া আঁচে, তারপর মধ্যম আঁচে তারপর সেই হান্ডির নীচে পুরু তাওয়া বসিয়ে ঢিমে আঁচে রেখে দেওয়া হলো আরো কিছুক্ষণ। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান,  সমাপ্ত হলো  সময় সাপেক্ষ নবাবি রন্ধন প্রক্রিয়া। হাঁড়ির ঢাকনা খুলতেই লা-জবাব  বিরিয়ানির খুসবুতে ম ম করে উঠল চারিপাশ ৷

এরপর যখন গরম গরম নবাবি বিরিয়ানি পরিবেশন করা হলো বাদামি করে ভেজে রাখা জুলিয়ান কাট পেয়াজ ছড়িয়ে,  তখন উচ্চ-নীচ ধর্ম-অধর্ম সংস্কার মুক্ত শ্বশুরবাড়ির পরিবেশের কথা মনে করে একটা ভাবনাই চলে আসছিল মনে ..."ফিরদৌস বার রু-ই জমিন আস্ত/হামিন আস্ত-ও হামিন আস্ত-ও হামিন আস্ত৷” বাংলায় অনুবাদ করলে যার মানে দাঁড়ায় ‘পৃথিবীতে কোথাও যদি স্বর্গ থাকে তবে এখানেই সেটা-এখানেই সেটা- এখানেই সেটা।'

শ্বাশুড়ি ঠাকরুন সদা আনন্দে থাকার  বীজমন্ত্র "জিও অর জিনে দো" সংসারে ছড়িয়ে দিয়ে পূর্ণ বয়সে স্বর্গারোহণ করেছেন।

পরিবারে ধর্মে আর জিরাফে কোনো ভেদাভেদ নেই ! সংসারে বিরাজমান সর্বধর্মের সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাস; হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান  ঐক্যের জয়গান।

আর কে না জানে....

"Food is, maybe the only universal thing that really has the power to bring everyone together. No matter what culture, everywhere around the world, people eat together."


Comments